ব্যুরো রিপোর্টঃ- NRC নিয়ে এইমুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সহ বাংলাদেশ গায়ে লাগা রাজ্য গুলিতে ঠাণ্ডা লড়াই চলছে রাজনৈতিক দলগুলি থেকে শুরু করে সাধারন জনগণের মনে, কি হবে কি না !! ইতিমধ্যে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে এসে স্পষ্ট ঘোষণা করে গেছেন NRC হবেই, তবে তার আগে পাশ করানো হবে CAB (Citizen Amendment Bill-নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল) । প্রত্যেক নাগরিককে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল-এর আওতায় আনার পরই নেওয়া হবে NRC সংক্রান্ত যাবতীয় পদক্ষেপ । তাই, একনজরে দেখে নেওয়া যাক CAB (Citizen Amendment Bill-নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল) আসলে কি !!

CAB (Citizen Amendment Bill-নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল) হল যার মাধ্যমে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী এবং
অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তারমধ্য থেকে
অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দেওয়া এবং উদ্বাস্তু বা শরণার্থীদের দেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা। কিন্তু কিভাবে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী এবং
অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরন সম্ভব ?? উঠছে এই প্রশ্ন। সুত্রানুসারে
রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক দপ্তর ‘ ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন অফ রিফিউজিস’ (UNHCR) ১৯৪১ সালের জেনেভা কনভেনশন এবং ১৯৬৭ সালের উরুগুয়ে প্রটোকল অনুসারে শরণার্থী এবং অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরনের জন্য যে সংজ্ঞা পেশ করা হয়েছিল, তা অনুসারে
“যদি কোনও দেশের কোনও মানুষ জাতি, ধর্ম, রাষ্ট্রীয়তা, সামাজিক বা রাজনৈতিক কোনও বিশেষ দলের সদস্য হওয়ার জন্য নিজের দেশে অত্যাচারিত হন এবং গভীর ভয়ের জন্য দেশে ফিরতে না চান অথবা ফিরতে না পারেন, তবে ওই মানুষটি দ্বিতীয় বা আশ্রয়দাতা দেশে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী হিসেবে গণ্য হবে কিন্তু নিজের দেশে সমস্ত সুযোগ সুবিধা পাওয়ার পরও উন্নত কর্মসংস্থান ও ব্যবসার বিরাট বাজার মনে করে অর্থনৈতিক লোভ অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের দেশ থেকে অন্য দেশে অবৈধ ভাবে প্রবেশ করে থাকতে চায় তবে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে গন্য হবে ।

এবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর রাখা যাক,

২৪ মার্চ, ১৯৭১-এর পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে চুক্তি হয়, ভারতে বাংলাদেশ থেকে কোন হিন্দু আসবেন না, কিন্তু সংখ্যালঘু হিসাবে যাতে বাংলাদেশে কোন হিন্দুকে নির্যাতিত হতে না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার সক্রিয় ও আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের উপর কোনও ধারাবাহিক চাপ কখনও প্রয়োগ করেনি, ফলে বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত হিন্দুদের শরণার্থী হয়ে ভারতে আসা বন্ধ হয়নি ফলে বাংলাদেশে জনসংখ্যাড় নিরিখে হিন্দুরা ২৯% থেকে কমে ৮% দাঁড়িয়েছে । ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সেই চাপ এসে পড়েছে বিশেষভাবে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ।

কিন্তু দুর্ভাগ্য তৎকালীন কেন্দ্র সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা-র রাজ্য সরকারগুলি বাংলাদেশ থেকে আসা এইসকল শরণার্থী বা উদ্বাস্তুদের ভবিষ্যৎ তাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে সর্বদা নীরব থেকেছে, কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি । এমনকি বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের পাশাপাশি বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করারও কোন উদ্যোগ নেয়নি।
অসহায় শরণার্থীরা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের অবহেলা ও অবিচারের শিকার রাজ্য গুলির স্থায়ী নাগরিকদের কাছে বোঝার সমান হয়ে উঠতে থাকে এবং তার বহিপ্রকাশ ঘতে আসাম রাজ্যে । ১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী অসমীয়াদের চাপে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ তারিখের ইন্দিরা- মুজিব চুক্তিতে উল্লিখিত শর্তের ভিত্তিতে আসামের সাথে যে চুক্তি করেন, যার পরিণাম শুধু অসমের জন্য NRC । কিন্তু তা সত্বেও কেন্দ্র ও অসমের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার বাঙালি হিন্দুরা যাতে NRC চুক্তি অনুযায়ী বৈধ নথিপত্র তৈরি করতে পারে তার জন্য আগ্রহ দেখায়নি, তবে সুত্রানুসারে আসামের সরকার পরিবর্তনের পর অসম থেকে তথ্য যাচাইয়ের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে পাঠানো বহু নথিপত্র পূর্বতন বামফ্রন্ট এবং বর্তমান রাজ্য সরকারের অবহেলা ও তাচ্ছিল্যের কারণে যাচাই করে ফেরত পাঠানো হয়নি। যার ফলশ্রুতি হয়ে দাঁড়ায় আসাম থেকে প্রায় ১২লক্ষ নাম বাদ ।

প্রসঙ্গত এর আগে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের নাগরিকত্ব আইনের ধারা ৩ – এর (জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব) ফাঁক দিয়ে বহু অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ভারতে নাগরিকত্ব পাচ্ছিল কিন্তু পূর্বতন ‘বাজপেয়ী সরকার’, ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনীর মাধ্যমে বাবা-মায়ের একজনও যদি বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হয় তবে ভারতে জন্মানো কোনও ব্যক্তি ভারতের নাগরিক হতে পারে না তা নিশ্চিত করেছিল এবং এই প্রথম কোনও কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে আগত মূলত হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদানের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হয়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৬ এনেছে।
২০১৬ সালের সংশোধনীতে পূর্বতন ও বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার আরো স্পষ্ট ভাবে বলেছে যে:-

আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ,পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ ভাবে হিন্দু-বৌদ্ধ জৈন পারসি-খৃষ্টান যাদেরকে কেন্দ্রীয় সরকার পাসপোর্ট আইন ১৯২০ – র ধারা ৩ এর উপধারা (২) অনুসারে অথবা ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬ প্রযুক্ত হওয়া থেকে ছাড় দিয়েছে, তারা এই আইনের (নাগরিকত্ব আইন) জন্য বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসাবে বিবেচিত হবেন না। শুধু তাই নয়, ২০১৬ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ তারিখের পরিবর্তে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে আগত সমস্ত হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ।
সুতরাং এককথায় বলা যায় যে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৬’ হচ্ছে শরণার্থীদের সুরক্ষা – কবচ। সেই কারনে পশ্চিমবঙ্গে আগে CAB (Citizen Amendment Bill-নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল) লাগু করা হবে যাতে আবার অসমের মতো অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি না হয় ।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This is todays COVID data

[covid-data]