নেশন লাইভ বাংলা বিশেষ প্রতিবেদনঃ-

“কাশ্মীর,হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্ব”
(প্রথম পর্ব)

উষ্ণ চঞ্চল ঝোড়ো হাওয়ার দল এসে শান্ত সৌম্য সমীরণ ধারায় পরিবর্তিত হয়ে ছুঁয়ে যায় এই পূণ্যভূমির চরণপদ্ম।চপলা চঞ্চলা স্রোতস্বিনীও কখন না জানি ছন্দমধুর তরঙ্গদলে রূপান্তরিত হয়ে যায় এই দেবভূমির পবিত্র স্পর্শে।বিহঙ্গ-বিহঙ্গমীরাও পরমপুরুষ শিব এবং চিরন্তন প্রকৃতিরূপী মাতৃশক্তির অনন্ত পুনর্মিলনীর সাক্ষী হয়ে অমরত্ব লাভ করেছিল এখানে।যমরাজের মৃত্যুময় বিভীষিকাও এই মায়াপুরীর স্বপ্ন-মাধুরীর জালে বন্দি হয়ে যাবার ভয়ে নিজের পা ফেলার সাহস করতো না এ মাটিতে।হয়তো নিজের পরাজয় এড়ানোর উদ্দেশ্যে।বিধাতাও বুঝি তার এই অমোঘ সৃষ্টির সৌন্দর্য্যের মন্ত্রমুগ্ধতায় ভাষাহীন হয়ে পড়েছিলেন।তাই যুগে যুগে নানা অজুহাতে নেমে এসেছেন এই ভূস্বর্গের কোলে।

কাশ্মীরকে প্রধানত তিনটি অংশে ভাগ করা যায়।কাশ্মীর উপত্যকা,জম্মু ও লাদাখ।কথিত আছে,রাজা জম্বুলোচন একদিন শিকার করতে করতে “তাভি” নদীর ধারে এসে উপনীত হন।হঠাৎ বিস্ময় জড়ানো দুচোখে দেখলেন,একটি বাঘ ও একটি ছাগল একসাথে জল খাচ্ছে।অদ্ভুত এই দৃশ্য দেখে অভিভূত মহারাজ তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন,এই স্থানে তার নামানুযায়ী একটি নগর গড়ে তুলবেন।হয়তো সেদিন,নিজের গভীর অন্তঃদৃষ্টিতে,দেবভূমির এই শান্তিময়তার গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন।মহারাজের নাম অনুসারে,প্রতিষ্ঠিত শহরটির নাম হয়েছিল “জম্বু”।যার নাম কালক্রমে লোকমুখে পরিবর্তিত হতে হতে আজকের জম্মু।সেও প্রায় 1400 খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের ঘটনা।মানে কি না,আজ থেকে প্রায় 3400 বছর আগের।

কাশ্মীর শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “কা” অর্থ্যাৎ “জল” এবং “শিমীর” অর্থ্যাৎ “শুষ্ক করা”।সুতরাং শাব্দিক অর্থে কাশ্মীর মানে “শুষ্কীকৃত ভূমি”।কলহণের “রাজতরঙ্গিণী” অনুযায়ী,কাশ্মীর পূর্বে ছিল একটি হ্রদ।হিন্দু পুরাণ মতে,ব্রহ্মাপুত্র মরীচির সন্তান ঋষি কাশ্যপ বারামুলার (বরাহ-মূল) দুই পাহাড়ের মাঝে ফাটল সৃষ্টির মাধ্যমে হ্রদটিকে শুকিয়ে ফেলেছিলেন।হ্রদটি শুকিয়ে যাবার পর ঋষি কাশ্যপের অনুরোধে জ্ঞানী -গুণী ব্রাহ্মণেরা সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন।ঋষি কাশ্যপের নাম অনুসারে,উপত্যকার প্রধান শহরের নাম হয়েছিল “কাশ্যপপুর”।

যেহেতু কাশ্মীরের পরিবেশ ছিল খুবই শান্ত,সৌম্য এবং মনোরম তাই কালক্রমে এই পূণ্যভূমি পরিচিত হয়ে উঠেছিল ঋষিদের বাসস্থান হিসেবে।প্রাচীন গ্রিকেরা এই স্থানকে বলতো “কাশপেরিয়া”।চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ 631 খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ কাশ্মীর উপত্যকায় আসেন।তিনি একে “কাহি মিলো” নামে অভিহিত করেন।মুনি ঋষিরা ভূস্বর্গের এই পবিত্র ভূমিতে তাদের তপস্যার জন্য নিরাপদ জায়গা খুজে পেয়েছিলেন বলে,এই স্থানকে কেন্দ্র করেই নিজেদের আবাসস্থল গড়ে তুলতে শুরু করেন।ঋষি কাশ্যপের নামানুসারে তারা এই স্থানের নাম রাখেন “কাশ্যপমর”।যা কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে আজকের কাশ্মীর।

প্রাচীন প্রবাদ মতে,প্রাগৈতিহাসিক যুগে কাশ্মীর উপত্যকা ছিল “সতীসর হ্রদ”;যেখানে নিবাস করতেন স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব।পরবর্তীতে বৈদিক সাহিত্য ও দর্শনের অনুশীলনের সাথে যুক্ত ব্রাহ্মণেরা ধীরে ধীরে এই স্থানে এসে বসবাস শুরু করতে লাগলেন।একটা সময় এমন এলো,যখন ভূস্বর্গ বৈদিক সাহিত্য এবং দর্শনের পান্ডিত্যে ও বিদ্যায় পরিপূর্ণ ব্রাহ্মণদের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে উঠেছিল।এমনকি ইসলামের রক্তরঞ্জিত বিজয়গাঁথার সাক্ষী আল-বেরুণীও অকপটে স্বীকার করেছেন যে,বারাণসী ও কাশ্মীর ছিল হিন্দু দর্শন ও বিজ্ঞানচর্চার পীঠস্থান।

কলহণের রাজতরঙ্গিণী মতে,কাশ্মীরের ইতিহাস শুরু হয়েছিল,কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কিছুকাল পূর্বেই।তার মতে,কাশ্মীরের প্রথম শাসনকর্তা ছিলেন রাজা গোনন্দ।কোন এক যুদ্ধে,রাজা গোনন্দ এবং তার ছেলে নিহত হন।মহাভারতের যুদ্ধের সময় কাশ্মীরের শাসক ছিলেন রাজা দ্বিতীয় গোনন্দ।

হিন্দুধর্ম এবং কাশ্মীরের মধ্যেকার নাড়ীর টানকে আরও গভীরে বুঝতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে সেই সম্রাট অশোকের আমলে।সম্রাট অশোকই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্তমানের সুপ্রাচীন শ্রীনগর শহর।প্রতিষ্ঠার সময় এর নাম ছিল “পন্ড্রীথান”;……..অর্থ্যাৎ,পন্ডিতদের আবাসস্থল।নাম থেকেই এ স্থানে পন্ডিতদের এবং হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব ও গুরুত্বের উপলব্ধি করা যায়।ভারতীয় ইতিহাসের সব থেকে প্রতাপশালী শাসক তথা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অশোকও সেদিন উপত্যকার হিন্দুদের ভক্তিপ্রাবল্যের সামনে পরাস্ত হয়ে বিজেশ্বরীতে এক সুরম্য শিবমন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় মানুষের মন জয় করা;………. যাদের বেশিরভাগই ছিলেন দেবাদিদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত।হয়তো সঙ্গোপনেই সেদিন কুর্ণিশ জানিয়েছিলেন বিশ্ব ধর্ম-সংস্কৃতির মহাকাশে বিস্ময় জোতিষ্করূপে বিরাজমান হিন্দু ধর্ম-দর্শন ও তার সনাতনী আদর্শকে।যে আদর্শ একজন নিষ্ঠাবান শিবভক্তকেও তার ভিন্নমতের একজন শাসককে অকুন্ঠচিত্তে ভারত সম্রাট হিসেবে মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।মানুষকে কর্মের ভিত্তিতে বিচার করতে শিখিয়েছিল,ধর্মের ভিত্তিতে নয়।

স্থানীয় লোকগাঁথা অনুযায়ী,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ থেকে শুরু করে ভগবান বুদ্ধদেব অবধি সকলেই নিজেদের জীবদ্দশায় কখনো না কখনো কাশ্মীরে এসেছেন।অশোকের মৃত্যুর পর তার পুত্র জলৌকা এবং জলৌকার মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় দামোদর কাশ্মীর শাসন করেছিলেন।এরপর প্রায় 200 বছরের জন্য কাশ্মীর চলে যায় ইন্দো-গ্রিকদের হাতে।এরপর আসে কুষাণেরা।কিন্তু কেউই কাশ্মীরের চিরাচরিত হিন্দু সংস্কৃতিকে ভুলুন্ঠিত করতে পারেননি এবং চেষ্টাও করেননি।বরং দেবভূমির প্রবল ভক্তিস্রোতের তরঙ্গধারায় যুগে যুগে নিজেদেরকে বিলীন করেছেন।এমনকী বৌদ্ধধর্ম মহাসঙ্ঘের একতা সুদৃঢ়করণের লক্ষ্যে সম্রাট কণিষ্ক যে চতুর্থ বৌদ্ধ সঙ্গীতির আয়োজন করেছিলেন,তার জন্যও বেছে নিয়েছিলেন হিন্দু ধর্ম-দর্শনের এই মানসতীর্থকে।

অখন্ড ভারত রাষ্ট্রের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা,মহর্ষি চাণক্য জন্মসূত্রে ছিলেন কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ; দেবভূমিরই এক মানস সন্তান।তা সে চন্দ্রগুপ্তের মতো সিংহবিক্রমীর সাহায্যে ভারতভূমিকে গ্রিক অপশাসনের হাত থেকে মুক্ত করার স্বাধীনতা যুদ্ধ হোক বা ভারতভূমির বিভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটিয়ে অখন্ড ভারত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংকল্প-সবেতেই এই ক্ষুরধার কাশ্মীরী মস্তিষ্কের অবদান ছিল অগ্রগণ্য।তবে কাশ্মীর প্রসঙ্গে বলতে গেলে যে নামটি না নিলেই নয় তা হলো রাজা ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়।”ভারতের আলেকজান্ডার” খ্যাত কর্কটবংশীয় এই মহামতির সম্পর্কে কথিত আছে,তিনি পূর্বভারত থেকে শুরু করে সুদুর মধ্য এশিয়া পর্যন্ত তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।ভারতের দিগন্ত ছাড়িয়ে হিন্দু সংস্কৃতির হিমেল হাওয়া ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মরুভূমির রূক্ষ প্রান্তরে।তবে যে শুধু সাহিত্য ও রাজনীতির ক্ষেত্রেই কাশ্মীরী মস্তিষ্ক তার উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিল তা নয়;বরং প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞান ও শিল্পকলার বিকাশেও কাশ্মীরী প্রতিভা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গিয়েছে।”ভারতের আইনস্টাইন” খ্যাত নাগার্জুন কাশ্মীরেরই মূল্যবান উপহার।ভারতীয় ও গ্রিক শিল্পকলার অপূর্ব সংমিশ্রণ “গান্ধার শিল্প” সম্রাট কণিষ্কের মস্তিষ্কপ্রসূত হলেও তার বৃহত্তর বিকাশে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল কাশ্মীরী স্নায়ু।

প্রাচীনকালে কাশ্মীর মানেই ছিল শান্তি,কাশ্মীর মানেই ছিল সৌহার্দ্য,কাশ্মীর মানেই ছিল সহাবস্থান।কাশ্মীর সম্পর্কে বর্ণণা করতে গিয়ে মহাকবি কালীদাস বলেছেন;

“” এ ভূমি স্বর্গ থেকেও সুন্দর এবং চিরন্তন সুখ ও আনন্দের ধাত্রী।এখানে এসে আমার মনে হচ্ছে,আমি যেন মধুর সাগরে অবগাহণ করছি।উপত্যকাটি যেন অসংখ্য মুক্তোর মাঝে উপস্থিত এক অত্যুজ্জ্বল রত্ন।হ্রদ,স্বচ্ছ জলধারা,সবুজ চারণক্ষেত্র,অপরূপ বৃক্ষরাজি এবং অসংখ্য অভ্রভেদী গিরিশৃঙ্গের সমারোহে পরিপূর্ণ এমন এক এক পাবণতীর্থ;যেখানে পবনধারা শীতল ও জলধারা মিষ্টি;যেখানকার পুরুষেরা শক্তসমর্থ এবং নারীরা ফুলের মতো সুন্দর। “”

কিন্তু,ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এ শান্তি চিরস্থায়ী ছিল না।সময়ের চাকা ঘুরতে আরম্ভ করেছিল।দেবভূমির তোরণদ্বার হিংস্র শ্বাপদের পদধ্বণিতে মুহুর্মুহু প্রকম্পিত হতে শুরু করেছিল।আরবীয় জেহাদী সংস্কৃতির বিষবাষ্প হিন্দু সংস্কৃতির এই পবিত্রভূমির কাঁধে নিশ্বাস ফেলছিল।কালের করাল গ্রাসে শান্তির পাবণতীর্থে শুরু হতে যাচ্ছিল ঘৃণা এবং হিংস্রতার এমন এক অন্ধকারময় যুগ,যার শেষ কোথায় আছে;তা বোধ হয় বিধাতাই বলতে পারবেন।

(…..ক্রমশ)

কলমে :- কল্যাণ বিশ্বাস সন্দীপ
মিডিয়া প্রমুখ ও বজরং সহ সংযোজক,
নদীয়া(দক্ষিণ) সাংগঠনিক জেলা;
নবদ্বীপ বিভাগ বজরং দল প্রভারী,
বজরং দল-মিলনকেন্দ্র সহ প্রমুখ,
দক্ষিণবঙ্গ প্রান্ত,
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This is todays COVID data

[covid-data]